Wednesday, June 4, 2025

Bbbbb



হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল
(নাট্যালেক্ষ্য)
রচনা- সম্বিত সাহা

( মঞ্চের এককোনে স্পটের আলোয় দেখা যায় রবিঠাকুরকে, অন্যপাশে নজরুল)

রবি- আজি হতে শতবর্ষ পরে
        কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
        কৌতুহলভরে, আজি হতে শতবর্ষ পরে!'

নজরুল- আজি হ'তে শতবর্ষ আগে 
             কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে
             শত অনুরাগে,
             আজি হ'তে শতবর্ষ আগে!'

রবি- আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের
        লেশমাত্র ভাগ--
        আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,
        আজিকার কোনো রক্তরাগ
        অনুরাগে সিক্ত করি পারিব না পাঠাইতে
       তোমাদের করে
       আজি হতে শতবর্ষ পরে।

নজরুল- শত বর্ষ পরে যথা তোমার কবিতাখানি
              পড়িতেছি রাতে!
              নেহারিলে বেদনা-উজ্জ্বল আখি-নীরে,
              আনমনা প্রজাপতি নীরব পাখায়
              উদাসীন, গেলে ধীরে ফিরে!

              আজি মোরা শত বর্ষ পরে

রবি-     তবু তুমি একবার,খুলিও দক্ষিণ দ্বার
            বসে বাতায়নে
            সুদূর দিগন্তে চাহি
            কল্পনায় অবগাহি, ভেবে দেখ মনে

            একদিন শতবর্ষ আগে

নজরুল- যৌবন-বেদনা-রাঙা তোমার কবিতাখানি
              পড়িতেছি অনুরাগ-ভরে।
              জড়িত জাগর ঘুমে শিথিল শয়নে
              শুনিতেছে প্রিয়া মোর তোমার ইঙ্গিত-গান
              সজল নয়নে, তোমা হতে শতবর্ষ পরে।

কথক- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর '১৪০০ সাল' কবিতা লেখেন ১৩০২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে। কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষের পরের পাঠককে বসন্তের পুষ্পাঞ্জলি পাঠিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ১৩৩৪ সালের আষাঢ় মাসে তাঁর '১৪০০ সাল' কবিতায় এর উত্তর লেখেন। তাতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভক্তি।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি নজরুলের মনোভাবের অকৃত্রিম পরিচয় ফুটে উঠেছে কবিতাটিতে। 
বাংলা সাহিত্যের দুই মহান কবির মধ্যে যে গভীর সুসম্পর্ক ছিল তা আমাদের অনেকেরই অজানা। 

( বোলপুর শান্তিনিকেতন ১৯২১)

সুধাকান্ত- কবিগুরু ওরা চলে এসেছেন।
রবি- শহিদুল্লাহ সাহেব এসেছেন? কই নিয়ে এসো তাঁকে।
শহিদুল্লাহ- প্রণাম কবিদেব। আজ আমার সাথে আর একজন তরুণ কবিও আছেন। আপনি হয়তো তার নাম শোনেননি।
রবি- শহিদুল্লাহ সাহেব, আপনি শান্তিনিকেতনে এসেছেন, এটা ভেবেই আমি ভিষণ খুশি। তার সাথে আবার একজন তরুণ কবি এতো উপরি পাওনা। হা হা। হ্যা তা সে কই? ভেতরে আসতে বলুন।
সুধাকান্ত- কবিগুরু, নজরুল ইসলাম। আপনি যার কথা বলছিলেন।
শহিদুল্লাহ- এসো নজরুল। কবিগুরু তোমাকে ডাকছেন। ( নজরুলের প্রবেশ)
রবি- না, না একদম পায়ে নয় বুকে এসো ভাই। কতদিন ধরে তোমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছি।
নজরুল- আমিও আপনার কন্ঠে আবৃত্তি শুনবো বলে অস্হির হয়ে আছি গুরুদেব।
রবি- সে কি? আমি যে তোমার গান ও আবৃত্তি শোনবার জন্যে প্রতীক্ষা করে আছি, তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।
নজরুল- হৈ হৈ রব
ঐ ভৈরব
হাঁকে, লাখে লাখে
ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল গৈরিক-গায় সৈনিক ধায় তালে তালে
ওই
পালে পালে, ধরা কাঁপে দাপে।
জাঁকে মহাকাল কাঁপে থরথর!
রণে কড়কড় কাড়া-খাঁড়া-ঘাত, শির পিষে হাঁকে রথ-ঘর্ঘর-ধ্বনি ঘররর!
'গুরু গরগর' বোলে ভেরী তূরী,
'হর হর হর'
করি চীৎকার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!
ওঠে ঝঝা ঝাপটি দাপটি সাপটি হু-হু-হু-হু-হু-হু-শনশন!
ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!

বরি- তুমি যখন এত সুন্দর একখানা কবিতা শোনালে তখন আমারোতো তোমাকে কিছু শোনাতে হয়। কি শোনাই বলতো, দাঁড়াও, হুম। মাধবী হঠাৎ কোথা হতে, এল ফাগুন দিনের স্রোতে, এসে হেসেই বলে যাই যাই।... চলুন শহীদুল্লাহ ভাই, শান্তিনিকেতনের ভাষা শিক্ষা নিয়ে আপনার সাথে দীর্ঘ আলাপের প্রয়োজন। আমরা হিজল গাছের ছায়ায় গিয়ে বসি।
শহীদুল্লাহ- হ্যা চলুন কবিবর, ওড্রমাগধী ভাষারীতি নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতেই তো এতদূর আসা৷
রবি- নজরুল তুমিও এসো ভাই। সুধাকান্ত এদের জলখাবারের ব্যবস্থা করো।

কথক- এরপর বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎ হয়। ১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করে পত্রিকার একটি কপি হাতে নিয়ে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে 'দে গরুর গা ধুইয়ে' গাইতে গাইতে নজরুল প্রবেশ করেন ঠাকুর বাড়িতে।

নজরুল- দে গরুর গা ধুইয়ে, দে গরুর গা ধুইয়ে। গুরুদেব গুরুদেব শুনতে পাচ্ছো? আমি নজরুল।

রবি- কে নজরুল? ওহ, তা এমন ষাঁড়ের মত চেচাচ্ছিস কেন? খুব বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিস বুঝি আজকাল!

নজরুল- গুরুদেব তুমি জানোনা, আমি,  আমি তোমাকে খুন করবো।

রবি- হা হা, খুন করবি, সেতো ভাল কথা। বুঝেছি, তোর তরোয়াল দিয়ে দাঁড়ি চাছার স্বভাবটা এখনো যায়নি। তা খুন করলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? ভেতরে আয়।

নজরুল- গুরুদেব, আমি বিদ্রোহী লিখেছি, তুমি পড়েছো?

রবি- হুমম, মনযোগ দিয়ে পড়েছি। কিন্তু দিব্যি বেঁচে আছি। খুন তো হইনি।

নজরুল- তাহলে আমার কন্ঠে শোনো একবার গুরুদেব।
বল বীর-

বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর -
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি' চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি' ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর! মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর -
আমি চির-উন্নত শির! আমি চিরদুৰ্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস, আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!

আমি দুর্ব্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, আমি দ'লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল! আমি মানি নাকো কোনো আইন, আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম,
ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর! আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!

বল বীর -
চির উন্নত মম শির!
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি' ছমকি' পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি' ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!

রবি- হ্যা, নজরুল তুই সত্যি সত্যি আমাকে ছাড়িয়ে গেছিস। আশির্বাদ করি তুই আরো আরো বড় কবি হ। এইবার আমি সত্যি সত্যি খুন হয়েছি। হা হা।

নজরুল- একবার তোমার চরণদুটো ছোঁয়ার অনুমতি দাও।

রবি-না, যে হাত অমন নির্ঝর কবিতা লিখতে পারে সে হাত চরণ কেন ছোঁবে? তুই আমার বুকে আয়।

কথক- রবীন্দ্রনাথ যেমন অনুজ নজরুলের প্রতি আশীর্বাণী প্রদান করে প্রীত হয়েছেন, তেমনি নজরুলও অগ্রজের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে হয়েছেন ধন্য। রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক বরাবর ছিল ভালো। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে যে কী স্নেহ করতেন তার আরেকটি উদাহরণ- রবীন্দ্রনাথ রচিত 'গোরা' উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুল ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এতে বাধ সাধলে রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালনার স্বীকৃতি প্রদান করেন। 

( কবিগুরুর বৈঠকখানা)
সুধাকান্ত- ঠাকুর, বিশ্বভারতী থেকে এই পত্রখানা গত কাল দিয়ে গেছে।
রবি- হ্যা, পড়েছি।
সুধাকান্ত- আপনি কি পত্রের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন?
রবি- না, বিশ্বভারতীর আপত্তি কি নজরুলকে নিয়ে?
সুধাকান্ত- তাই তো লিখেছে, বিশ্বভারতী আপনার মতামত জানতে চায়।
রবি- কেন? নজরুল মুসলমান বলে ওদের আপত্তি?
সুধাকান্ত- না ঠিক তা নয়,
রবি- তাহলে, শোন নজরুলকে আমি ডেকে পাঠিয়েছি। সে এলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।
সুধাকান্ত- অবশ্যই। আর কবিগুরু, বিশ্বভারতীকে কি জবাব দেব?
রবি- জানিয়ে দেবে আমার 'গোরা' উপন্যাস থেকে যে চলচ্চিত্র হবে, তাতে সঙ্গীত পরিচালনা নজরুলই করবে। নজরুলকে ছাড়া ও কাজ হবেনা। ( নজরুলের প্রবেশ)
নজরুল- আমি এসে গেছি গুরুদেব। কই দাও আমার 'ধুমকেতু'র জন্যে লেখা।
রবি - ওরে দাঁড়া, দাঁড়া। এসেই একেবারে ঝড় তুলে দিলি?
নজরুল- তুমিতো জানো আমি বাউন্ডুলে। তোমার মতন ভদ্দর লোক তো নই। আচ্ছা গুরুদেব, তুমিতো ইতালীতে গেছো সেখানে কবি দ্যনুনজিও'র সাথে তোমার দেখা হয়েছিল?
রবি- দেখা হবে কি করে, সে যে তোর থেকেও আরো বড় বাউন্ডুলে। শোন 'গোরা' সিনেমার কাজটা মন দিয়ে কর। আমি বিশ্বভারতীকে বলে দিয়েছি।
নজরুল- আমাকে দিয়ে কি ও কাজ হবে? আমিতো সিনেমার কিছু জানিনা।
রবি- গানটাতো জানিস। ওতেই হবে। সুধাকান্ত অন্দর মহলে একটু খবর দিওতো, নজরুল এসেছে।
সুধাকান্ত- ঠিক আছে কবিদেব। আমি তাহলে আজ আসি।
রবি- এসো। আচ্ছা নজরুল তোর বাড়িতো পুরুলিয়া, কাছেই বোলপুরে আমি একটি বিদ্যা নিকেতন করেছি। নাম শান্তিনিকেতন। আমি চাই তুই সেখানকার শারীরিক শিক্ষার ভারটা নে।
নজরুল- এইযে তুমি আমাকে দিয়ে আবার লেফট রাইট করাবার বুদ্ধি আটছো। না, না ওসব আমাকে দিয়ে হবেনা। কোন বাঁধাধরা কাজে আমার মন বসেনা।
রবি- হুমম, তুই হলি বাঁধনহারা। বোস। লেখাটা কি হলো তোকে শোনাই।
নজরুল- হ্যা শোনাও শোনাও-
রবি- আয় চলে আয়, রে, ধূমকেতু,
আধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে'
আছে যারা অর্ধচেতন!'
নজরুল- তোমার চরণ দুটিতে আমাকে ঠাঁই দিও গুরুদেব। আর কিছু চাইনাঞ।
রবি- তোকেতো বলেছি তোর স্থান এই হৃদয়ে। চরণে তোর ঠাঁই হবেনা। চল অন্দরে যাই। (প্রস্থান)

কথক- ধূমকেতুর ১২শ সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) প্রকাশিত নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' নামক একটি প্রতীকধর্মী কবিতা প্রকাশের পর নজরুলকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ মামলা করা হয়। ১৯২৩-এর ১৬ জানুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো মামলার রায় দেন। এতে নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়। 
( জেলখানা)
নজরুল- আনন্দময়ীর আগমনে আবৃত্তি করতে থাকে। ( কারারক্ষীর প্রবেশ)
কারারক্ষী- নজরুল তোমার অনশন বন্ধ করার নির্দেশ এসেছে।
নজরুল- আমি মানিনা, কারো নির্দেশ আমি মানিনা। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মাতৃভূমি স্বাধীন হবে ততক্ষণ আমার অনশন চলবেই। কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট রক্ত জমাট শেকল পূজার পাষান বেদী।
কারারক্ষী- এ নির্দেশ তোমায় বৃটিশ সরকার দেয়নি, দিয়েছেন তোমার গুরুদেব।
নজরুল- আমার গুরুদেব কখনোই আমাকে এমন নির্দেশ দেবেননা।
কারারক্ষী- আমি গতকালই প্রেসিডেন্সি জেল থেকে বদলী হয়ে এই হুগলি জেলে এসেছি। এসে অব্দি আমি তোমার খোঁজ করছি।
নজরুল- কেন?
কারারক্ষী- আমি তোমার গানের একজন ভক্ত। তোমাকে দেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। শোনো প্রেসিডেন্সী জেলে কবিগুরুর কাছ থেকে তোমার নামে একটা টেলিগ্রাম এসেছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
নজরুল- কি লেখা ছিল সেই টেলিগ্রামে তুমি দেখেছো? আমার দূর্ভাগ্য সেই টেলিগ্রামটি আমি নিজের হাতে দেখতে পেলামনা।
কারারক্ষী- সেই টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্সীর জেলার সেই টেলিগ্রামটির একটা কপি করে রেখেছিলেন। সেই কপিটি আমার হাতে তিনি পাঠিয়েছেন তোমার জন্য।
নজরুল- কই দাও দাও। আমাকে দাও। "Give up hunger strike, our literature claims you."
গুরুদেব, তোমায় প্রণাম। ( নজরুল আবেগে কাঁদতে থাকে)
কারারক্ষী - নজরুল, শান্ত হও। শোনো, কবিগুরু তোমাকে এই আত্মহননের পথ থেকে সরে আসতে বলেছেন।
নজরুল- কিন্তু আমিতো নিজেকে শান্ত করতে পারছিনা৷ এই দেশ আর দেশের মানুষের জন্যই তো আমি লিখতে পারি। এরা না বাঁচলে আমি কী নিয়ে লিখব। গুরুদেবের মত অত বড় কবিতো আমি নই। এই দেশের দারিদ্র পীড়িত সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কাউকে তো আমি চিনিনা। তিনি আমার নামে তার 'বসন্ত' গীতিনাট্যটি উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই আশির্বাদ পেয়ে আমি জেলের সব যন্ত্রনা ভুলে গেছি। তাইতো আজ হাসিমুখে অনশন করতে পারছি। কবিগুরু আমাকে একটা চিঠিও লিখেছিলেন। চিঠিতে লিখেছিলেন, 'নজরুল, আমি নিজের হাতে তোমাকে এই গ্রন্থ দিতে পারলাম না বলে  যেন দুঃখ করোনা। আমি তোমাকে সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই বন্ধ করোনা। সৈনিক অনেক মিলবে কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জোগাবার কবিও তো চাই।' কবিগুরু তোমার আশির্বাদ আমি মাথা পেতে নিলাম। আর আমার রচিত 'সঞ্চিতা' গ্রন্থখানি তোমাকে উৎসর্গ করলাম।

কথক- নজরুলের প্রতি রবিন্দ্রনাথের এমন পিতৃসুলভ স্নেহ অনেক কবি সাহিত্যিকেরই গাত্রদাহের কারণ হয়েছিল। তারা রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে মুখোমুখি দাঁড় করাবার চেষ্টা করে আসছিলেন সেই স্বাধীনতা পূর্ব কাল থেকেই। আর দ্বীজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর ব্রাহ্ম, প্রকৃতিবাদী রবিন্দ্রনাথকে হিন্দু বানানোর চেষ্টা আর সাম্যবাদী, মানুষের মুক্তিকামী নজরুলকে মুসলমান বানানোর চেষ্টা করে আসছে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী দলগুলো। পিতা- পুত্রের মত এই দুই কবির স্নেহ শ্রদ্ধার সম্পর্ককে মুখোমুখি দুইধর্মের অস্ত্র বানানো চেষ্টা করেছেন ধর্মব্যাবসায়ী রাজনীতিবিদেরা। কিন্তু তাতে করে সঞ্চয়িতা আর সঞ্চিতার কবিদ্বয় যে কেবলি আমাদের হৃদয়ে আর চেতনায় ঠাঁই পেয়েছেন তাই নয় তাঁরা হয়ে উঠেছেন বাঙালীর আত্মচেতনার নিশ্চিত আশ্রয়  ।

(ঠাকুরবাড়ির বৈঠকখানা)

রবি- পবিত্র,  আমার টেলিগ্রাম ফেরত এসেছে। নজরুল প্রেসিডেন্সিতে নেই।

পবিত্র- উনি হুগলি জেলে আছেন ঠাকুর আপনার বার্তা তিনি পেয়েছেন।

রবি- হুমম। ছেলেটাকে নিয়ে বড় ভাবনা হয়।

পবিত্র- ঠাকুর আপনি যে নজরুলকে এত স্নেহ করেন সকলে এটা ভালো চোখে দেখেনা।

রবি- জানি। ওরা নজরুলকে জানেনা। নজরুলের প্রতিভা সম্পর্কে জানেনা। আর ওদের কথা কি বলবো নজরুল নিজেই কি ছাই জানে যে ও কতো বড় কবি।

পবিত্র- আপনি সত্যি কি তাই মনে করেন?

রবি- পবিত্র জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। নজরুলকে আমি 'বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গ পত্রে তাকে 'কবি' বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে অনেকেই এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।

পবিত্র- আমি পড়েছি ওর কবিতা। প্রাচীন, আধুনিক কোন কিছুর সাথেই ওকে মেলানো যায়না।

রবি- নজরুলের কাব্যে অসির ঝনঝনানি আছে। আমি যদি তরুণ হতাম তা হলে আমার কলমেও ওই একই ঝংকার বাজতো। জানো পবিত্র মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। মানবিক ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উর্ধ্বে।  নজরুলের কবিতায় মানুষের প্রতি ওর গভীর আস্থা দেখেছি । দেখবে এই ধূলিমাখা, অসহায়, দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।

কথক- রবীন্দ্রনাথের বয়স আশি বছর পূর্তি হয় ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। তখন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লিখেন, 'অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি'। ১৯২০ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পূর্বকাল পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্নেহ ও শ্রদ্ধার। 


রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে নজরুল যে গভীরভাবে শোকাভিভূত হয়েছিলেন তার পরিচয় রবীন্দ্রনাথের পরলোকগমনে তাৎক্ষণিকভাবে রচিত নজরুলের বিভিন্ন কবিতা ও গানে পাওয়া যায়। এই দিন (২২ শ্রাবণ' ১৩৪৮) কাজী নজরুল ইসলাম আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে ধারাবর্ণনা প্রচার করেন। তিনি আবৃত্তি করেন 'রবিহারা' কবিতা এবং রচনা করেন 'ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে'। এ ছাড়া 'সালাম অস্তরবি' এবং 'মৃত্যুহীন রবীন্দ্র' নামে দুটি কবিতা রচনা করেন। 


রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরেই নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়।

( গান- সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল)


No comments:

Post a Comment

This month’s best new literary fiction

Don't miss the best new literary fiction from the past month, hand-picked by our editors! Don't miss this month's literary ficti...