Tuesday, July 15, 2025

G-

মাজেদ রানা


আপনি নিশ্চয়ই জানেন
যাঁরা নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে রাখে
মিথ্যে লজ্জা স্থান সমূহকে ঢেকে রাখে
তাদের আর মিছিলে যাওয়া হয় না
নগ্ন পা মৃত্তিকার মৃসণ বুক অস্পৃশ্যা হয়ে পড়ে সাবলীল বাতাসের শিরদাঁড়া টা
বড় কষ্টকর হয়ে ঠেকে।

আপনি নিশ্চয়ই জানেন
রাত কখন গভীর হয়
শোক কখন পদত্যাগ করে
ভালোবাসার কাদামাটি কখন নতুন ঘর বাঁধে।


দিনাজপুর তথা বাংলাদেশের কিংবদন্তি মঞ্চ অভিনেতা, নাট্য ব্যক্তিত্ব মাজেদ রানা ১৯৪৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর শহরের ফকিরপাড়া মহল্লায় নানার বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ী রংপুর জেলার বদরগঞ্জে। বাবার চাকুরী সূত্রে তিনি দিনাজপুরের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মোস্তফা আবু তাহের, মা মাহামুদা বেগম। এক ভাই দুই বোনের মধ্যে মাজেদ রানা সবার বড়। বাবা ছিলেন পোষ্ট অফিসের কর্মকর্তা। ষাট দশকের প্রথম দিকে প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র থাকার সময় মাজেদ রানা ঈদগাহবস্তি এলাকায় পাড়ার ছেলে মেয়েদের নিয়ে চকি দিয়ে মঞ্চ সাজিয়ে শরৎচন্দ্রের "রামের সুমতি" নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। এই নাটকে মাজেদ রানা রামের ভূমিকায় অভিনয় করেন। স্কুল জীবনে মাজেদ রানার গান নাটকের দিকে ঝোঁক ছিল বেশি। আর এইসব চর্চায় তাঁর প্রথম পথ প্রদর্শক ছিলো দিনাজপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবিভক্ত বাংলার কবি, সাহিত্যিক ও উপন্যাসিক কাজী কাদের নেওয়াজ, সহ-শিক্ষক রম্য-রচনা লেখক, নাট্যকার বগুড়ার তাজমিলুর রহমান, সহ-শিক্ষক নাট্যকার বাবু গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য ও সহ-শিক্ষক নাট্যকার শাহদাত হোসেন। স্কুলে মাজেদ রানা শিক্ষকদের লেখা কলির জ্বীন, কূপন ও বাস্তু ঘুঘু পাঠশালা প্রভৃতি নাটকে সাফল্যের সাথে অভিনয় করেন।

১৯৬৪ সালে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাজেদ রানা এস.এন কলেজে আই.কম এ ভর্তি হয়। এখানে তিনি নাট্যকার শাহাজাহন শাহর সংস্পশে আসেন।  স্কুল কলেজ গুলিতে তখন মৌলিক নাটক বেশী মঞ্চস্থ হতো। কলেজ জীবনে মাজেদ রানা শাহজাহান শাহ্ রচিত ও পরিচালিত কারটোপে, রক্ত স্বাক্ষর, আত্মহননের গান, জান দেব জবান দেব না, ক্ষুধা, লালু ভুলু ও নিমাই সার পরিচালিত "দুইয়ের পিঠে এক শূন্য", এইসব নাটকে সাফল্যের সাথে অভিনয় করেন এবং দিনাজপুরের একজন উদীয়মান নাট্যশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৬৫ সালে নবরূপীর 'চোরাবালি' নাটকের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মাজেদ রানা বৃহত্তর নাট্যঙ্গনে পদচারনা শুরু করে। ১৯৬৮ইং সালে মাজেদ রানা অতিথি শিল্পী হিসেবে পার্থ-প্রতিম চৌধুরী রচিত জিল্লুর রহমান পরিচালিত দিনাজপুর নাট্য সমিতির 'হায়নার দাঁত' নাটকে বগুড়ার চিত্রাভিনেত্রী সুলতা চৌধুরীর সাথে
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকটি পরপর চার রাত্রি "হাইজফুল" দর্শকের উপস্থিতিতে নাট্য সমিতি মঞ্চে অভিনিত হয়। ফলে মাজেদ রানার অভিনয়ের প্রতিভার কথা বগুড়া সহ সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাজেদ রানার প্রথম পরিচালিত নাটক কল্যান মিত্রের "শুভ বিবাহ"।
মাজেদ রানা দিনাজপুরের প্রতিষ্ঠিত নাট্য শিল্পী ও সংগঠক কাজী বোরহান, মকবুল হোসেন, আকবর আলী ঝুনু, ফটিক দাস গুপ্ত ও দিনাজপুরের তখনকার আনসার এডজুটেন্ট বগুড়ার কে.জি কাদেরের সংস্পর্শে আসেন। বিশেষ করে কাজী বোরহান ও কে.জি কাদের তাঁর অভিনয় প্রতিভার উপর রূপ, রস, গন্ধ ছড়িয়ে তাঁকে এক পরিপূর্ন শিল্পীতে পরিনত করেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায় বলে মাজেদ রানা নিজেকে বাংলাদেশের একজন প্রথম শ্রেণির মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে নবরূপী বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। মাজেদ রানা সে আন্দোলনের একজন প্রথম সারির সক্রিয় সদস্য। উৎপল দত্তের গণনাট্য "আলোর পথযাত্রী" নাটক নিয়ে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে অভিনয় করে আন্দোলনের সপক্ষে জনমত সৃষ্টিতে মাজেদ রানা ব্রতী হন।

১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে নবরূপীর প্রতিটি সদস্য সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। মাজেদ রানা ভারতে গঙ্গারামপুর থানার শিববাড়ি ক্যাম্পে নাম নিবন্ধন করেন। প্রথম দিকের খানপুর যুদ্ধে মাজেদ রানা গুলি কেরিয়ার হিসেবে কাজ করেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় নবরূপীর শিল্পীরা একত্রিত হয়ে একটি সাংস্কৃতিক দল গঠন করে ভারত ও বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থী ক্যাম্পে (রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, গঙ্গারামপুর, বালুরঘাট, সর্বমঙ্গলা) বিভিন্ন জায়গায় স্বাধীনতার সপক্ষে গণজাগরনমূলক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে ধ্বংস স্তুপের উপর আবার মাজেদ রানা নাট্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

দিনাজপুর নাট্য সমিতির ১৯৭৩ ও ১৯৮১ সালের নাট্য উৎসব ও অভিনয় প্রতিযোগিতায় নবরূপীর "ভূমিকম্পের পরে" ও "ইডিপাস" নাটকে অভিনয় করে মাজেদ রানা শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন এবং ঐ প্রতিযোগিতায় নবরূপীর অন্যছায়া (১৯৭৩) ও ইডিপাস (১৯৮১) নাটকে মাজেদ রানা দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহ আর্ট কাউন্সেল যে আন্ত-জেলা নাট্য উৎসব ও অভিনয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করে দিনাজপুর নাট্য সমিতি তাতে রতন কুমার ঘোষ রচিত কাজী বোরহান পরিচালিত "ভূমিকম্পের পরে" নাটকটি মঞ্চস্থ করে। ১৬টি বৃহত্তর জেলার নাট্য উপস্থাপনার মধ্যে প্রযোজনা, পরিচালনা ও অভিনয় সহ আটটি পুরস্কার পায় দিনাজপুর নাট্য সমিতি। অভিনয়ের পুরস্কারটি ছিল মাজেদ রানার অর্জন।

১৯৭৬ সালে নাট্য সমিতির নাট্য উৎসব ও অভিনয় প্রতিযোগিতায় নবরূপীর "ক্যাপ্টেন হররা" নাটকে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য মাজেদ রানা দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। এই 'ক্যাপ্টেন হুররা' নাটকটি বাংলাদেশের বহু জেলা শহরে অনবদ্য উপস্থাপনার জন্য প্রশংসিত হয়। ১৯৭৮ সালে বৃটিশ কাউন্সেলের উদ্দ্যোগে ঢাকায় একটি থিয়েটার ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়। ঐ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন লন্ডনের শেক্সপেরিয়ান থিয়েটার গ্রুপের নির্দেশক ইউলিয়াম রোজার ক্রাউচার। বাংলাদেশের যে কয়জন নাট্য শিল্পী এই ওয়াকশপে সুযোগ পায় মাজেদ রানা ও শাহজাহান শাহ্ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এইখানে মাজেদ রানা শেক্সপিয়রের "মিড সামার নাইট ড্রিমস" নাটকে সাফল্যের সাথে অভিনয় করে প্রশংসিত হন।

১৯৭৯ সালে মাজেদ রানা মমতাজ বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাঁদের দুই মেয়ে কাশমিন হুসনাইন ও মারিফুন নাগমা। মাজেদ রানা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি দক্ষতার সঙ্গে তাঁর চাকুরী জীবন শেষ করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ সরল সাধারণ মানুষ। পরিবারের চেয়ে নাট্য সংগঠন ছিল তার কাছে অধিক প্রিয়। সন্তানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নাটকের ছাত্রছাত্রীরা। তিনি থিয়েটারে নিবেদিত প্রাণ একজন শিল্পী ছিলেন। মূলতঃ অভিনেতা হলেও নির্দেশক ও প্রশিক্ষক মাজেদ রানা ছিলেন অনন্য। তাঁর নির্দেশনায় অভিনয় প্রশিক্ষনই ছিল মুখ্য বিষয়। তিনি ছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও নবরূপী দিনাজপুর পরিচালিত নাট্য প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রথম প্রশিক্ষক। তিনি নবরূপীর নাট্য সম্পাদক পদটি দীর্ঘকাল অলংকৃত করে গেছেন।

মাজেদ রানা অভিনীত নাটকের সংখ্যা ৫০টির মত এর মধ্যে বিশেষ নাটকগুলি হচ্ছে- সামনের পৃথিবী, সম্রাটের মৃত্যু, হায়নার দাঁত, অন্ধকারে একজন, সম্রাট, কালিন্দী, ভূমিকম্পের পরে, একটি পয়সা, ইত্যাদি ধরনের প্রভৃতি, ইডিপাস, রামসাগর, বিক্ষুদ্ধ অতীত ও নজরুল, কান্না থাম রক্ত, রক্ত গোলাপের যাদুকর, ক্যাপ্টেন হুররা ও যামিনীর শেষ সংলাপ। মাজেদ রানার যামিনীর শেষ সংলাপ নাটকের অভিনয় দেখে নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমেদ তাঁর মন্তব্যে বলেন 'এ নাটকে চিত্রাভিনেতা গোলাম মোস্তাফার অভিনয় আমাকে অভিভূত করেছে। কিন্তু এই নাটকে মাজেদ রানার অভিনয় আমাকে কাঁদিয়েছে।'


মাজেদ রানার পরিচালিত নাটকগুলি হচ্ছে- অন্যছায়া, ইডিপাস, কবর, টিপু সুলতান, জম্বুদ্বীপের ইতিকথা, নুরলদীনের সারাজীবন, কাঁটা, ঝিঁ ঝিঁ পোকার কান্না, রক্ত করবী। রক্ত করবী মাজেদ রানার একটি মাষ্টার পিস প্রযোজনা। যা বাংলাদেশে বেশ কয়টি জেলায় সুনামের সঙ্গে অভিনীত হয়েছে।

কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ মাজেদ রানা তাঁর যুবাকাল থেকেই নানান পুরস্কার, সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,
শিখা সংসদ সম্মাননা - ১৯৭৮
সবুজ মন সম্মাননা- ১৯৯৪
খুলনা নাট্য নিকেতন ২০০০ সম্মাননা
প্রাকৃতজন বিশেষ সম্মাননা ২০০২
Amateur Theatre Association - Theatre award 2004
বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা সম্মাননা ২০০৩
গ্যালারী ষড়ং সম্মাননা ২০০৩
উদীচী দিনাজপুর সম্মাননা- ২০০৯
দিনাজপুর নাট্য সমিতি সম্মাননা ২০১০
জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদক ২০১৪
স্বামী বিবেকানন্দ সম্মাননা- ২০১৬
শাহজাহান শাহ সম্মাননা (মরণোত্তর) - ২০১৮

এক চাঁদে পাওয়া মানুষ ছিলেন মাজেদ রানা। সংসারের বদ্ধ জলে আবদ্ধ থেকেও কেমন করে তিনি দূর সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতেন! সাঁতার কাটতেন। নাটকের চরিত্র নিয়ে ভাবতেন আর তার চারিত্রায়ণ ঘটাতেন। অমূর্তকে মূর্ত করে ফেলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল মাজেদ রানার। চিত্রকর যেমন অমূর্তকে মূর্ত করে তোলেন, কখনও পরিপ্রেক্ষিতের প্রয়োজনে বিমূর্ত; তেমনি মাজেদ রানাও মঞ্চে চরিত্রকে অমূর্ত থেকে মূর্ত আর বিমূর্ত করে তুলতে পারতেন। এ তো জাত শিল্পীর কাজ! এমন খ্যাপাটে জাত শিল্পী ছিলেন মাজেদ রানা।

হায় ম্যাকবেথ,

ডানকানকে হত্যার আগেই তুমি নিহত হয়েছিলে, রক্তাক্ত হয়েছিল গহীন অন্তরে।

মধ্যরাত্রির অন্ধকারের নেশা,
দিনের শেষ আলোটুকু আকণ্ঠ পান করবার নেশা তুমি ছাড়তে পারেননি,
ম্যাকবেথের রক্তের নেশা,
ওউদিপাউসের সত্য জানার নেশা
আর যামিনিবাবু তোমার অভিনয়ের নেশা!
কাঁচা রক্তের নেশা হত্যায় যুদ্ধে, দাঙ্গায়,
জঙ্গরসে এত বেশি লাল

হায় ম্যাকবেথ, হত্যার রক্ত এখনও লেগে আছে আমাদের হাতে
তুমি পালিয়ে গেলে তো হবে না।
বারবার হাত ধুচ্ছি কিছুতেই যাচ্ছেনা, যাচ্ছেনা। ম্যাকবেথ আমরা তোমার ফেলে যাওয়া আহত সৈনিক আগাছার বন হয়ে পিছু নিয়েছি তোমার।



No comments:

Post a Comment

Security alert for zakirhossain19992022@gmail.com

This is a copy of a security alert sent to zakirhossain19992022@gmail.com . lcitins@gmail.com is the recovery email for this account. If y...